ধরুন শেষ বেলার ভাঙা বাজারে গিয়েছেন আপনি। বসে আছেন একজন মাত্র বিক্রেতা। তার কাছে একটি মাত্র দরকারি সব্জি। আলু, পেয়াঁজ জাতীয় রোজকার রান্নায় দরকার পড়ে এমন সব্জি পড়ে আছে মাত্র একখানা। কিন্তু ক্রেতা দু’জন। আপনি এবং আরও এক ব্যক্তি। এবং সে আপনারই জেন্ডারের, আপনারই বয়সের। আকারেও অনেকটা আপনারই মতো। অর্থাৎ আপনি পুরুষ হলে অপর ক্রেতা ব্যক্তিটিও আপনার বয়সের পুরুষ। আপনি নারী হলে অপর ক্রেতা ব্যক্তিটিও আপনার বয়সের নারী। আপনারা একে অপরকে আগে কখনও দেখননি কিংবা দেখে থাকলেও থাকতে পারেন। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনও অবকাশ নেই সেই মুহূর্তে। এই অবস্থায় আপনি কী করবেন। ক্রেতার কাছে পড়ে থাকা অত্যাবশকীয় সেই সব্জিটি আপনি ব্যাগবন্দী করবেন, নাকি অপর ব্যক্তিকে বলবেন ‘না না আপনিই নিন’? আর হ্যাঁ, আপনারা দু’জনে একই সময় ওই ক্রেতার কাছে এসেছিলেন এবং একই সময় ওই সব্জির দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন বা বাড়াতে যাচ্ছিলেন। এবার বলুন কী করবেন?

মুদ্রার যেমন দু’টি দিক বা পিঠ, তেমনই এই সমাজেরও দু’টি দিক। ভালো এবং মন্দ। একজনের কাছে যা ভালো, অপরজনের কাছে তা ভালো নাও মনে হতে পারে। ভালো মন্দের এই ফারাক যত বাড়তে থাকে ততই সৃষ্টি হয় দ্বন্দের। বাড়তে থাকে একে অপরের সাপেক্ষে বিপরীতমুখী গতি। ক্রমে বাড়তে থাকে দুরত্ব। জাঢ্য বেশি হলে সুতো ছিঁড়ে কক্ষপথ চ্যুত হওয়ার প্রবল সম্ভবনা। এই প্রবল সম্ভাবনা সত্যি হলে, অর্থাৎ সুতো ছিঁড়ে কক্ষপথ থেকে বেড়িয়ে গেলে আপনি হয়ে যাবেন বিচ্ছিন্ন। সিস্টেমের থেকে আলাদা। মানে পৃথিবী যদি কোনও দিন সূর্যের সমস্ত টান উপেক্ষা করে নিজের কক্ষপথকে বিদায় জানায় তখন তাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে এই সৌরজগৎ। অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ হবে বিচ্ছিন্ন। অর্থাৎ সিস্টেম বা সমাজ চ্যুত। কোনও ব্যক্তিও যদি সমস্ত সামাজিক টানকে খারিজ করে দেয় তবে তারও অবস্থা হবে কক্ষপথ চ্যুত পৃথিবীর মতো।

পৃথিবীর কক্ষপথ চ্যুত হওয়া যেমন অকল্পনীয়, অবাস্তব ভাবনা সুলভ, তেমনই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানোর কল্পনাও অমূলকের মতো। ভালো লাগুক বা না লাগুক, আপনাকে থাকতে হবে এই সমাজ বা সিস্টেমেই। মৃত্যু ছাড়া চিরতরে বিদায় জানানোর কোনও উপায় বোধকরি আপাতত নেই।

উপায় যখন নেই তখন সবার সঙ্গেই মিলেমিশে থাকতে হবে। মনের বা ভাবনার বা মতের মিল না থাকলেও মানিয়ে চলতে হবে। একটা পয়সার মধ্যেই থাকবে হেড এবং টেল।

কোনটা ঠিক এবং কোনটা ভুল তা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে নির্ণয় করতে পারেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু যখনই বিপরীতমুখী দুই ভাবনা একে অপরের কাছে এসে উপস্থিত হয় তখনই নির্গত হয় শক্তি। দু’জনেই নিজের ভাবনার অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন নিজের মতো করে। বিপরীত দু’টি মেরু যত কাছাকাছি আসতে থাকে ততই বাড়তে থাকে প্রবল সংঘর্ষের সম্ভাবনা। যুক্ত হয়ে স্থিতিতে আসার আগে ঠোকাঠুকি অবশ্যম্ভাবী। যতক্ষণ না স্থিতিতে আসবে ততক্ষণ নিজের মতো করে উদ্যাম বেগে ছুটে চলবে বিপরীত ভাবনাদ্বয়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রাজনৈতিক আলোচনা বিরাট জায়গা জুড়ে রয়েছে। কেউ বলবেন অমুক সরকার ভালো তো কেই বলবেন তমুক সরকার। একই সমাজের মধ্যে দাঁড়িয়েই কিন্তু আমরা এই কথাগুলো বলি। এবং এও জানি, আপনার ভাবনার প্রেক্ষিতে বিপরীত মত পোষণ করেন এমন ব্যক্তি থাকবেই থাকবে। বিপরীত কোনও মত না থাকা বা প্রত্যেক ব্যক্তি একই রকম চিন্তা পোষণ করছে এমন ভাবনা কি বাস্তব? পৃথিবী কি ছিটকে যেতে পারবে সূর্যের থেকে?

একই ভাবনা মানে কারও সঙ্গে কোনও দ্বন্দ নেই। যে যার নিজের মতো করে রয়েছেন। প্রত্যেকের সুখের বা দুখের মাত্রা সমান। কাউকে দেখে কারও মনে হিংসা জাগে না, ধর্মের বা রাজনীতির নামে কোনও মারামারি, খুনোখুনি নেই। খবরের কাগজে শুধু ফুল ফোটার খবর। মনে হচ্ছে কল্পরাজ্যের কথা বলছি?

এই স্থিতি কিন্তু সম্ভব। অন্তত চুম্বকের নিয়মে সম্ভব। দুই বিপরীত মেরু বিশিষ্ট চুম্বকে যুক্ত হওয়ার পর শান্ত থাকে একে অপরের হাত ধরে। তার আগে পর্যন্ত নিজের ভাবনাকে আরও প্রবলভাবে জমাট করা। প্রবল দ্বন্দ। সর্বকালের সর্বইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সংঘর্ষ।