দ্বিতীয় পর্ব

সৌভিক রায় (কলকাতা) : দীর্ঘ তিন দশকের অভিনয়ের পর ভারত সরকার তাঁকে পুরস্কার প্ৰদান করে,যা বিভাজনকে ইঙ্গিত করে ; তিনিও বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন অনেক পুরস্কার। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার তিনি গ্রহণ করেননি। আদৰ্শর কাছে মাথা না নামানো বাংলা ও বাঙালির তাঁর কাছে শেখা উচিত। সেই কারণে তিনি এই সেদিন পর্যন্ত সরব ছিলেন শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইতে, গত বছর CAA NRC এর বিরুদ্ধে আন্দোলনেও যুক্ত থেকেছেন স্বাক্ষর করেছেন এর বিরুদ্ধে। মানুষের হয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েই মারা গেলেন !

কিন্তু তাতে কি এ দায় এ কলঙ্ক তো রাষ্ট্রের চালিকা শক্তির আমাদের দেশে ভূপেন হাজারিকা কে ভারতরত্ন দেওয়া হয় অথচ সেই তাঁর নামই বাদ পড়ে নাগরিক তালিকা থেকে। সৌমিত্র বাবুও অনেকটা তাই “দাদা সাহেব ফালকে”, ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সন্মান, কিন্তু তা পেয়েও তিনি দেশদ্রোহী। এই নাহলে শিল্পীর জীবন ? সেই সুদূর ফ্স থেকে তাঁকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সন্মান লিজিয়ান অফ অনার দেওয়া হয়, শেষ যে বাঙালি এ পুরুষ্কার পেয়েছেন তিনি হলেন সত্যজিৎ রায় ! এই অসুস্থ হওয়ার আগেও পুজো সংখ্যার জন্যে লিখেছেন লকডাউন নিয়ে কবিতা। বাম মুখপত্র লিখেছেন এখন তাঁর মনে হয় বামপন্থাই এক মাত্র পথ !

সৌমিত্র অভিনেতা হওয়ার পাশাপাশি একজন নির্দেশক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, কবি, গদ্যকার, পত্রিকা সম্পাদক, অনুবাদক, বাচিক শিল্পী, চিত্রশিল্পী, রেডিও ঘোষক, সংবাদ পাঠক, একজন শক্তিশালী গায়কীকণ্ঠের অধিকারী – এক নিঃশ্বাসে বলা যাবে না তিনি কতো কিছু ! সাহিত্যিক সৌমিত্রকে নিয়ে একটু কথা হোক বরং ! তিনি আদতে একজন কবি, এবং তাঁর নিমগ্নতার রসদ হলো কবিতা। একজন অতন্ত্য ভালো পাঠক ছিলেন তিনি, অসুস্থ হয়ে নার্সিংহোমে যাওয়ার আগে শেষ বই পড়েছিলেন শেক্সপিয়ার বিষয়ক, বহু কবিতা তিনি পাঠ করেছেন রেডিওর জন্যে শেষের কবিতা থেকে এই আশি বছর বয়সে প্রাক্তন ছবির হঠাৎ দেখা,

এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আবৃত্তির আবদার রাখা করতেন তিনি, অদ্ভুত স্পষ্ট বাচনভঙ্গি, ঈর্ষণীয় উচ্চারন এবং অনুরণনীয় কণ্ঠস্বর মুগ্ধ করতো শ্রবনীন্দ্রিয়কে, অন্যের কবিতা পড়লেও নিজের কবিতা পড়তে খুবই কম দেখা যেতো ! তিনি লাজুক কবি, সহজ সরল জীবন থেকে নেওয়া শব্দ চয়ন, সাধারণ ভাষার ব্যবহার তাঁর কবিতার প্রধান আকর্ষণ, তাঁর প্রথমদিকের বই গুলোতেও গদ্যকবিতা রয়েছে।
নাটক এবং গদ্যের সংকলন রয়েছে তাঁর, এই করোনা সময়ে তিনি তাঁর ডাইরি জুড়ে লিখেছেন এঁকেছেন, এই আঁকার অভ্যেসটিও অবশ্য বেশি পুরোনো নয় ! ২০১৯ সালে তাঁর কবিতা সমগ্র প্রকাশিত হয়, ৮০০পৃষ্ঠার কবিতা সমগ্র-এ তাঁর সব কবিতাই স্থান পেয়েছে।

১৯৭৫ সালে কবি সৌমিত্রের আত্মপ্রকাশ, “জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে ” প্রকাশিত হয়, এটির প্রচ্ছদ করেন তাঁর প্রিয় মানিক দা। ৫৪টি কবিতা নিয়ে অন্নপূর্ণা পাবলিশিং হাউস এটি প্রকাশ করেন, তাঁর সর্বমোট প্রকাশিত কবিতার বই-এর সংখ্যা ১৪টি ! কবি সৌমিত্রের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল শক্তি এঁদের সাথে নিয়মিত আড্ডা দিতেন সৌমিত্র, বইপড়ার কফিহাউসে। সুনীল তাঁর সহপাঠী, এছাড়া সাহিত্যিকদের মধ্যে শীর্ষেন্দু ছিলেন তাঁর বন্ধ।

তাঁর ব্যাক্তিগত নক্ষত্রমালা, পড়ে আছে চন্দনের চিতায়, হায় চিরজল, পদ্মবীজের মালা,অগ্রপথিক, শ্রেষ্ঠ কবিতা হে সায়ংকাল, জন্ম যায় জন্ম যাবে সমৃদ্ধ করেছে বাংলা কবিতাকে, বর্ণপরিচয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে হলুদ রোদ্দুর, ৪৮টি কবিতা নিয়ে সিগনেট প্রেস থেকে এসেছে মধ্যরাতের সংকেত। কবি সৌমিত্র অনিয়মিত বহমান এবং সে একাকিত্বের কবি, তাঁর কবিতার অনুষঙ্গে ছত্রে ছত্রে জীবন, আমিত্ব এবং জীবনের প্রবহমানতা। বাংলার লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই মানুষটি নির্মাল্য আচার্য্য-এর সঙ্গে বহু দিন সহসম্পাদনা করেছেন এক্ষন পত্রিকার, ১৩৬৮বঙ্গাব্দে পত্রিকার পথ চলা শুরু, নামাঙ্কন করেছিলেন সত্যজিৎ ! এক্ষন বহু কাজ করেছে, পুরোনো হারিয়ে যাওয়া লেখা কে খুঁজে আনা এবং ছাপা; পুনর্মুদ্রণ বলে একটি বিভাগই ছিলো, কমলনাথ মজুমদারের উপন্যাস কে ক্রোড়পত্রে নিয়ে আসা, ধারাবাহিক উপন্যাস ছাপা, পাশ্চাত্যের লেখা দেরিদা,ফুকো, লাঁকা প্রমুখের লেখা অনুবাদ, শেক্সপিয়ার, দান্তে, মার্ক্স প্রমুখ বিশ্ব বরেণ্য মানুষদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করা ইত্যাদি।

শুরুতেই ছক্কা হাকিয়ে ছিলো এক্ষন, মৃনাল সেনের প্রবন্ধ, বিষ্ণু দে, অরুন মিত্রের কবিতা এই ছিলো প্রথম সংখ্যার পাঠকদের বিশেষ ব্যাঞ্জন। সত্যজিৎ এই পত্রিকার প্রচ্ছদও করেছেন কয়েকবার, তাঁর ছবির চিত্রনাট্যও প্রকাশিত হয়ে এখানে, সে সংখ্যাও নেহাত কম না ২২টিএই পত্রিকার ৭৯টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো, তারপর অভিপ্রেত নিয়মেই বন্ধ হয়ে যায় এক্ষন ; অন্যান্য সবুজ পত্রের মতোই। সত্যজিৎ কে জানতে সাহায্য করে তাঁর বই “মানিকদার সঙ্গে” তিনি লিখতেন যেমন বইকে ভালোওবাসতেন তেমন, মৃত্যুর পরে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন গীতবিতান ও আবোল তাবোল !

৩৫০এর বেশি ছবি ও কয়েক হাজার নাটকের শো এবং দীর্ঘ ছয় দশকের এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথ তিনি একজন সৃষ্টিশীল মেধাবীর মতোই যাপন করেছেন, অর্থ অহংকার কিছুই তাঁকে ছুঁতে পারেনি ! সাধারণ হয়েই কাটালেন জীবন, পড়ার ঘরে থাকতো অজস্র বই, শিশিস ভাদুড়ির ছবি – একটা সেক্রেটারি পর্যন্ত রাখতেন না ! ওঁর মতো মেধা বাংলা কেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল, বাংলা সংস্কৃতির শেষ আইকন হয়তো তিনিই ছিলেন, মেধা প্রাজ্ঞ, বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় এবং বৌদ্ধিক বিশ্লেষন ও সাহিত্যের ছাত্র হয়েও তাঁর সব বিষয়ের জ্ঞান মুগ্ধ করে আপামর ভারতীয়দের, তাইতো তাঁর মৃত্যুর পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০০টির বেশি সংবাদ পত্রে শোক বার্তা ছাপা হয় ইউরোপ থেকে এশিয়া জুড়ে সেই সব দেশ, আমূল প্রথা ভেঙে প্রাদেশিক ভাষায় এবং ইংরেজিতে মোট দুটি কার্টুন করে, ক্যাডবেরি ইন্ডিয়া, ভারতের বিনোদন থেকে ক্রীড়াজগৎ সবাই শোকবার্তা দেয়। দৈনিক পত্রিকা গুলি পাতার পর পাতা বরাদ্দ করে তাঁর জন্যে আজও ; আর কটা বঙ্গ সন্তানের জন্যে এ জিনিস হয়েছে বলুন , সংখ্যা গুনলে আঙুলের করেই কুলিয়ে যাবে! তাঁর শেষ কাজ বেলাশুরু আসছে, তাঁর জীবনী নির্ভর ছবি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় “অভিযান” আসতে চলেছেন, আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলা তাঁকে নিয়ে সাজাতে চলেছে এবারের আর্ট গ্যালারি; এমনটাই গিল্ড সূত্রে খবর। তাঁর মেয়ে পৌলোমী তৈরী করছেন তাঁর আর্কাইভ! এ সব থেকেও তিনি নেই, হারাধনের ছেলেদের মতো এক এক করে স্বর্ণযুগের শেষ পুরুষও বিদায় নিলেন। বিরল মেধা যার মধ্যে বহুপ্রতিভা কেন্দ্রীভূত, এমন অভিনেতা বাংলায় আছে কিনা এখন হাতড়াতে হবে আমাদের, আগে যেটা চট করেই বলে দেওয়া যেতো! আমাদের একটা সৌমিত্র আছে থেকে আমাদের একটা সৌমিত্র ছিলো – বলা, এবার থেকে অভ্যাস করবে বাঙালি।

প্রথম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

(সমাপ্ত)