অভিমান্য পাল (নদিয়া) : “ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা , যমের দুয়ারে পড়লো কাটা , যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা , আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা”

সত্যিই বাঙালি পারেও বটে ! বারো মাসে যেন তেরো পার্বণ লেগেই আছে । তারই একটা অংশ হল ভাইফোঁটা । ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় ভগবানের কাছে সাফল্য-দীর্ঘায়ু প্রার্থনাই বোনের কাম্য । এটাই ভাইফোঁটা হিসেবে উদযাপিত । পঞ্জিকার মতে কালীপুজোর দু-দিন পর অর্থাৎ দ্বিতীয়ায় অনুষ্ঠিত হয় ভাইফোঁটা । তাই দিনটিকে আমরা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বলে থাকি ।

ভাই ও বোন দুজনের অপেক্ষায় থাকে বছরের এই একটি দিনের জন্য । খুনসুটি দূরে রেখে আসনে ভাইকে বসিয়ে , সামনে থালায় ফুল আর মিষ্টি দিয়ে সাজানো । অন্য একটি থালায় ধান-দূর্বা । ঘরে আমপাতায় পারা কাজল , চন্দন । সঙ্গে প্রদীপ , শঙ্খ । বোন বাম হাতের কড়ে আঙুলে কাজল নিয়ে একেঁ দেয় ।

ভাইফোঁটার ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে দেখা যায় , চতুর্দশ শতাব্দীতে সর্বানন্দসুরী নামে এক আচার্য পণ্ডিতের তালপাতার পুঁথি “দীপোৎসবকল্প” এর কথা । আবার এও জানা যায় যে , জৈন ধর্মের অন্যতম মহাপ্রচারক মহাবীর বর্ধমানের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর অন্যতম অনুগত সঙ্গী রাজা নন্দীবর্ধন মানসিক এবং শারীরিক ভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েন । শেষ পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ।

এই রকম অবস্থায় তাঁর প্রিয় বোন অনূসুয়া নন্দীবর্ধনকে তাঁর নিজের বাড়িতে নিয়ে যান । দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষে দ্বিতীয়া তিথি । রাজার কপালে রাজতিলক পড়িয়ে বোন অনূসুয়া ভাইকে মিষ্টি খাইয়ে দেন । আর বলেন-“রাজ্যের প্রজারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে , এই অনশন তোমাকে মানায় না । হে ভ্রাতা , হে রাজন , রাজতিলক এঁকে দিলাম তোমার কপালে এবং ক্ষুধা নিরসনের জন্য গ্রহণ করো খাদ্য ।

তুমি সাদর আপ্যায়িত হও । সর্ববিধ মঙ্গলের জন্য তুমি জেগে ওঠো , ভগবান তোমার মঙ্গল করুন । তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করি । প্রতি বছর এই দিনে তোমাকে রাজতিলক পড়িয়ে অভিষিক্ত করা হবে , এই আমার ব্রত । বোনের মুখে এই কথা শুনে রাজা ভালো হয়ে যান । “দীপোৎসবকল্প”-এর এই ইতিহাস ও কাহিনীর সূত্র ধরে ভাইফোঁটা উৎসবের সূচনা হয় ।

“মৎস্যপূরাণ” এ উল্লেখ আছে সূর্যদেবতার তিন পত্নী আছে । যথা —- সংজ্ঞা , প্রভা ও রজনী । সংজ্ঞা ও সূর্যদেবের দুই পুত্রের নাম মনু আর যম । আর কন্যা যমুনা । ওই সুপ্রাচীন গ্রন্থ মতে , মনুর উত্তরসূরিরাই মানুষ । পরবর্তীকালে যমুনার সাথে বিয়ে হয় শ্রীকৃষ্নের অগ্রজ বলরামের । দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি । বিয়ের আগে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে ভাইয়ের মঙ্গল কামনা করেছিলেন যমুনা । এটা ঠিক যে , ভাইফোঁটা উৎসব যমের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেন ।

বাংলার বাইরেও ভাইফোঁটা পালন হয় । কোথাও কোথাও তার নাম ভাইটিকা , ভাইদুজ , ভাই বিছিয়া , ভাইলগন বা ভাতিলগন বলা হয়ে থাকে । একটা বিষয় স্পষ্ট যে , এই উৎসবের আসল লক্ষ্য হল. “কল্যাণ কামনা” ।