প্রথম পর্ব

সৌভিক রায় (কলকাতা) : বাংলা বরাবর ভারতকে পথ দেখিয়েছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সাহিত্য, কৃষ্টি থেকে কলা, সংগীত থেকে নাটক সবেতেই ইতিহাস তৈরী করেছে পূর্বভারতের এই রাজ্য ! বাংলায় বহু ক্ষেত্রে বহু কৃতি এসেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন এই ঐতিহ্যকে তাঁদের সপ্রতিভ প্রজ্ঞা ও মেধার দ্বারা কিন্তু কেউ কেউ বিরল থেকেও বিরলতম হয়ে উঠেছেন তাঁদের বহুমুখী প্রতিভার গুনে – চোখ বুঝে মনে পড়ে এমন কজনের নাম রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ! এই শেষ নামটিও বিদায় নিলেন গতরবিবার, দীর্ঘ রোগ ভোগের পর আজ তিনি শুধুই কিংবদন্তি; জীবন্ত কথাটা বাদ। সৌমিত্রকে একটি পরিচয়ে ব্যাক্ত করার স্পর্ধা আমার নেই, আমি কেন কোনো কলমেরই হয়তো নেই।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের দুটি লাইন ধার নিলাম- এখনো তোমার দিকে তাকালে, এই বুঝি মনে হয়, নবারুণ জাগালে। আমরা ছয় দশক ধরে অভিনেতা সৌমিত্রকে দেখছি পর্দার ময়ূরবাহন থেকে শুরু করে বিশ্বনাথ মজুমদার আবার কথনো সে ফেলুদা, কখনো ক্ষিতদা, পোস্তর গুরুজী, মঞ্চের লিয়ার ! সত্যজিৎ আর শিশির ভাদুড়ির মিশেছে তাঁর মধ্যে – সে সৌমিত্র আমাদের চেনা। আজ একটু অচেনা সৌমিত্র বা অল্প চেনা সৌমিত্রকে নিয়েই বলবো, আদ্যপ্রান্ত এক জন চিন্তাশীল মানুষ তিনি।
সৌমিত্র কি বামপন্থী ছিলেন ? ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে, দুটি শক্তিশালী দলের কথা জানা যায় এক ভারতীকংগ্রেস যার বয়স দেড় শতাব্দীর বেশি এবং তুলনায় নবীন তাও শতাব্দী প্রাচীন কমিউনিস্ট পার্টি, স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে প্রথম দুটি নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী বলতে ছিলো কেবল বামপন্থীরাই।

আর সৌমিত্র যখন বেড়ে উঠছেন তখন এ রাজ্যে একের পর এক আন্দোলন করে সক্রিয় হচ্ছে বামেরা,মানুষেম দাবি প্রতিষ্ঠার সে লড়াই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বামদের ধারাবাহিক আন্দোলন পরবর্তীতে তৈরী করে যুক্ত ফ্রন্টের সরকার ও পরে সাড়ে তিন দশকের বাম সরকার। এই সময় বাংলায় কংগ্রেসরাজ আর সৌখন ছাত্রাবস্থায়, ভারতে আজ ছাত্র রাজনীতির একটি নির্দিষট প্যাটার্ন আছে; এখনও দেশের অগ্রণী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনেকগুলি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা মূলত বামপন্থী …এই ট্রেন্ড বহুদিনের।

এরপর কর্মজীবন চলাকালীন তিনি ৬৬-এর খাদ্য আন্দোলনে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিছিল করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন সে দৃশ্যও বাংলা দেখেছে। আসলে সত্যি কথা বলতে কি সেই সময় বাংলার সকল সৃজনশীল সুস্থসংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষই একটু বামমনস্ক ছিলেন এবং পৃথিবীর ইতিহাসও সেই কথা বলে। ভারতে যেকয়টি রাজনৈতিক দল রয়েছে তার মধ্যে মুক্তমনা চিন্তক মানুষদের ভিড় সব সময়ই বামেদের দিকেই হয়েছে। কারণ তারা প্রগতিশীল, তারা চিন্তা করেন এবং তাদের দলে বহুত্ববাদ ও ভিন্নমত পোষণের জায়গা রয়েছে।

একটি মানুষ তার আদর্শগত ভাবে, তিনটি প্রকারে যেকোনো জিনিসকে অনুসরণ করত পারে এক, সে একটি নির্দিষ্ট নীতিকে অনুরসন করবে ! দ্বিতীয়ত, সে একটি নির্দিষ্ট ব্যাক্তির অনুগামী হতে পারে ! নয়তো সে তিনি নতুন পথ আবিষ্কার করে সেই পথে চলতে পারে। সৌমিত্র নিজে ছিলেন দ্বিতীয়শ্রেণীর, তিনি সমর্থন করেছেন আদর্শগত ভাবেই ; সে নজির রয়েছে, একাধিকবার শিল্পী কলাকুশলী সংগঠনের হয়ে তাঁদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে তিনি পৌঁছে দিতে গেছেন সরকারের কাছে। কখনো তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়ার জন্যে, কখনো তাঁদের সরকারি স্বীকৃতির দাবিতে।

(ক্রমশ)