সৌভিক রায় (কলকাতা) : অর্নিথোলজি ; মানেই পাখি নিয়ে চর্চা ! এতো আমাদের সকলেরই জানা । আর ভারতে পাখির কথা বললেই চলে আসে আমাদের জাতীয় পাখি ময়ূর এবং আমাদের বার্ডম্যান সেলিম আলীর কথা । ভারতের পাখিচর্চার পথিকৃৎ কিন্তু সেলিম আলী নন ! বার্ড ম্যানের অনেক আগেই এক সাহেব কাজটি শুরু করেছিলেন ; তিনি হলেন অ্যালন অক্টোভিয়ান হিউম,তাঁর জন্ম হয় ইংল্যান্ডে ১৮২৯ সালে,ব্রিটিশভারতে তিনি ICS অর্থাৎ একজন প্রশাসক হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন ।

ইতিহাসের বই তে তাঁর সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় ; সেই “সেফটি ভাল্ব” তত্ত্ব ! জাতীয় কংগ্রেস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠিতা হলেন হিউম,কিন্তু এছাড়াও ওর সব চেয়েবড়ো কৃতিত্ব হলো তিনিই প্রথম বৈজ্ঞনিক উপায়ে ভারতীয় পাখদের নিয়ে কাজ শুরু করেন । হিউম ও তার সতীর্থেরা মিলে প্রচুর পাখির নমুনা এবং পাখি বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করেন, কিন্তু ১৮৫৭এর কিছু পরে তিনি যখন সিমলায় পোস্টেড হন,তখন প্রবল ভূমিকম্পে তার বাড়িটি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার বহু স্পেসিমেন  নষ্ট হয়ে যায় । এই সময়ই তার ভারতীয় পাখিদের নিয়ে লেখা নিবন্ধের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায় । এরপর থেকে তিনি ন্যাচারা হিস্ট্রি মিউজিয়ামে (  লন্ডন )তার সংগ্রহ করা নমুনা পাঠাতে থাকেন এবং ভারতীয় পাখিদের চর্চা সমান গতিতে এগোতে থাকে ।

অবসরের পরে দেশে ফিরে হিউম তৈরী করেন সাউথ লন্ডন বোটানিক্যাল সোসাইটি । ভারতে প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ভাবে পক্ষিবিদ্যা চর্চা প্রারম্ভ করার জন্য হিউমি-এর অবদান অসীম,তাই সঙ্গত কারণেই হিউমকে ‘ভারতীয় পক্ষিবিজ্ঞানের জনক’ বা  ‘Father Of Indian Ornithology’ হিসেবে অভিহিত করা হয় ।

আসুন ময়ূরে ফেরা যাক ! আজ সে আমাদের জাতীয় পাখি কিন্তু তার বদলে অন্য একটি পাখি জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিলো এই সন্মানীয় স্থানটি , সে আজ বড়ো কষ্টে আছে । বর্তমানে এক বিপদজনক ভাবে লুপ্ত প্রজাতি ,সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে যাদের সংখ্যা কমবেশি ১৫০ মাত্র ! যদিও ১৯৭২ -এর পরিবেশ সংরক্ষন আইন দ্বারা এরা সুরক্ষিত তবু পরিবর্তনশীল পরিবেশ ,শিকার ইত্যাদির জন্য এদের সংখ্যা ক্রমশই কমেছে । মূলতঃ ভারতীয় উপমহাদেশের এই পাখি হলো গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড ! দেখতে অনেকটা উটপাখি বা ওই অস্ট্রিচের মতো ,দেহ অতিকায় এবং ওজনে প্রায় পনেরো ষোলো কিলোগ্রামের মতো যা গ্রেট ইন্ডিয়াই বাস্টার্ডকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী উড়তে সক্ষম পাখির কৃতিত্ব দিয়েছে ।

পশ্চিমভারত অর্থাৎ রাজস্থান ,গুজরাট , মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যে এদের দেখা যেতো ,পাকিস্তানেও এক সময় ভালো সংখ্যায় এরা উড়ে বেড়াতো । মাংসের জন্য প্রচুর পরিমাণে চোরা শিকারও করা হতো,সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছিলো অনেকদিন ধরেই , সেলিম আলী একটা পথ ভাবলেন । একে ভারতের জাতীয় পাখি করলে হয়তো , সংরক্ষণে গুরুত্ব বাড়বে এবং অবলুপ্তিরও আর সম্ভবনা থাকবে না ,কিন্তু বাদ সাধলো একটি শব্দ “বাস্টার্ড ” ! ব্যাস আর কী ! একটুর জন্য জাস্ট একটুর জন্য ওর আর ভারতের জাতীয় পাখি হওয়া হলো না । কর্তা ব্যাক্তিরা খারিজ করলেন সেলিম আলীর প্রস্তাব ,ফলে রাজস্থানের রাজ্য পাখি হয়েই কাটিয়ে দিতে হলো এতগুলো দশক , আগামী কতো গুলো বছর যে তারা এই রাজ্য পাখির স্থান ধরে রাখতে পারবে তা বলা যায় না ! হয়তো কোনো দিন ঘুম থেকে উঠে কাগজে পড়বেন এরাও বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে অচিরেই , মানুষ আর সভ্যতার দাপটে হেরে গিয়ে।