কবিরাজ থেকে ডাক্তার গোঁড়ামি ভেঙে গড়লেন ইতিহাস

শেয়ার করুন

সৌভিক রায় :
(দ্বিতীয় পর্ব)
মধুসূদন গুপ্তকে কম কণ্টকময় পথ পেরোতে হয়নি! তাঁর নামে খেউর করে সং অর্থাৎ বিদ্রুপ ব্যাঙ্গাত্মক গান বাঁধা হয়েছিলো সেই সময়ের কলকাতায়। মধুসূদন গুপ্ত কার্যত একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধোপা নাপিত পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো! সমাজপতিদের রোষানলে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু শুরু করতেই হতো তাঁর তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ, বিপ্লব ঘটালেন একা হাতেই।

তিনি যখন মেডিক্যাল কলেজে পড়াতে এসেছিলেন, দেশের চিকিৎসকদের তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো শব ব্যবচ্ছেদ। মানুষের চিকিৎসা করতেন তাঁরা, অথচ মানুষের শব ব্যবচ্ছেদ করে ব্যবহারিক জ্ঞান তাঁরা অর্জন করতে পারতেন না। পশুর দেহ ব্যবচ্ছেদ করে কোনও রকমে চিনতে হতো মানব শরীরের অভ্যন্তর। কুসংস্কারপীড়িত অন্ধবিশ্বাস দুষ্ট সমাজ মানব মৃতদেহ ছুঁতে দিতেন না ডাক্তারদের।চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্ররা তাও মেনে নিতেন মুখ বুঝেই। মধুসূদন গুপ্ত বিরোধিতা করলেন। বোধহয় পটভূমি তৈরী হয়েগিয়েছিলো ইতিহাস লেখার জন্যে!
অসুবিধাও হচ্ছিলো সাহেব শিক্ষকদেরও। ডা.গুডিভ একদিন পড়ানোর টেবিলে একটি শবদেহ রেখে দীর্ঘক্ষণ ছাত্রদের বোঝালেন শব ব্যবচ্ছেদের গুরুত্ব।

এগিয়ে এলেন মধুসূদন, দিনটা ছিলো ওই ১৮৩৬ সালের ১০ই জানুয়ারি ছুরি হাতে মধুসূদন প্রথম ব্যবচ্ছেদ করলেন মানব মৃতদেহ, তৈরি হল ইতিহাস।
উচ্চবর্ণের হিন্দুরা প্রাচীনপন্থীরা যে ক্ষেপে উঠেছিলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ হিন্দু মুসলিম উভয়ধর্মের ফতেয়া উপেক্ষা করেই তিনি এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন।

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন যে, ‘সেকালের লোকের মুখে শুনিয়াছি এই মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ লইয়া সে সময়ে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল।’ জাতিচ্যুত করেও মধুসূদন গুপ্তকে দমানো যায়নি। নব্যবঙ্গ এই সময় তাঁকে সর্মথন জানিয়েছিল এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নব্যবঙ্গের নেতৃত্বেরা। শোনা যায় শব ব্যবচ্ছেদ করার পর তাঁর জন্যে তোপধ্বনি করা হয়েছিলো, ২১ তোপ দাগা হয়েছিলো ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। কিছু কিছু বাড়ি থেকে শাঁখ বেজেছিল, পুষ্পবর্ষণও করা হয়েছিলো। ওই বছরই ২৮শে অক্টোবর মধুসূদন গুপ্তের অনুপ্রেরণায় চার জন ছাত্র রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারিকানাথ গুপ্ত, উমাচরণ শেঠ এবং নবীনচন্দ্র মিত্র এগিয়ে এসেছিলেন শব ব্যবচ্ছেদ করতে। এইভাবেই ক্রমে ক্রমে পিছু হঠল সমাজপতিরা, থেমে গেলো আন্দোলন। আস্তে আস্তে জিতে গেলো বিজ্ঞান মনস্কতা! কান্ডারি হয়ে রইলেন মধুসূদন গুপ্ত। পরিসংখ্যান বলছে, এখানে ১৮৩৭ সালে সর্বমোট ৬০টি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছিলো।

এলিট ড্রিংকওয়াটার সেই দিনের ঘটনার স্মৃতিচারণা করেছেন। অনেকটা এই রকম ছিল বিবরণ…
“… মেডিকেল কলেজের সব ফটকগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, পাছে এই বিধর্মী কাজ বন্ধ করার জন্য প্রাচীনপন্থীরা কলেজে আক্রমণ চালায়! মেডিকেল কলেজের মর্গে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, সেখানে উপস্থিত মেডিকেল কলেজের সব ইংরেজ অধ্যাপক, ছাত্রেরা ভিড় করে দাঁড়িয়েছে ঘরের বাইরের দরজায়, জানালার ফাঁকে ফাঁকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছে অনেকে। সারা ক্যাম্পাস ফাঁকা। নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার গুডিভের সঙ্গে দৃপ্তপদে ঘরে ঢুকলেন একদা সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্র পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত। বর্তমানে যিনি একই সঙ্গে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও ছাত্র। ডাক্তারী শাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ সার্জারি, যা ভারতে এখনও করানো সম্ভব হয়নি, শবব্যবচ্ছেদ নিয়ে বর্ণ হিন্দুদের গোঁড়া কুসংস্কারের জন্য, সেই কাজটিই আজ করতে এসেছেন পন্ডিত মধুসূদন, হাতে তাঁর একটি শব ব্যবচ্ছেদ করার তীক্ষ্ণ ছুরি। তাঁর সঙ্গে যোগ দেবার জন্য দলে নাম ছিল উমাচরণ শেঠ, রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকানাথ গুপ্ত ও নবীন চন্দ্র মিত্রের। কিন্তু তাঁরা দরজার বাইরেই ভিড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ঘরে ঢুকে মধুসূদন বিনাদ্বিধায় এগিয়ে গেলেন শবের দিকে। শবদেহের নির্ভুল জায়গায় ছুরিটি প্রবেশ করালেন তিনি। মুখে কোনও আড়ষ্টতা বা অস্থিরতার চিহ্ন নেই। খুব নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করলেন ব্যবচ্ছেদের কাজ। ভারতবর্ষের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞানী শুশ্রূতের পরে এই প্রথম হল শবব্যবচ্ছেদ। দীর্ঘকালের কুসংস্কারের আর গোঁড়া পন্ডিতদের বাধা নিষেধের বেড়া ভেঙে দিলেন তিনি এই একটি কাজের মাধ্যমে। নিষেধের জগদ্দল ভার সরিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভারতবর্ষ এক নতুন যুগে প্রবেশ করল।”

১৮৪৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ল্যান্সেট-এর সম্পাদকে একটি চিঠিতে সাহেব চিকিৎসক গুডিভ এই ঘটনার বিবরণ জানিয়ে লিখেছিলেন – “The most important blow which has yet been struck at the root of native prejudices and superstition, was accomplished by the establishment of the Medical College of Calcutta, and the introduction of practical anatomy as a part of the professional education of Brahmins and Rajpoots, who may now be seen dissecting with an avidity and industry which was little anticipated by those who know their strong religious prejudices upon this point twenty years since.”

১৮৩৯ সালে ভারতীয় সৈন্যদের চিকিৎসার জন্যে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের একটি বিভাগের গোড়াপত্তন করা হয়েছিলো। ১৮৪২ সালে এই বিভাগটি যখন ঢেলে সাজানো হয়েছিলো মধুসূদন দত্তের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, তিনিই উক্ত বিভাগের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এই বিভাগ পরিচালনা এবং তৎকালীন সময়ে প্রাচীনপন্থী ভাবধারার হিন্দু রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্যে রাজী করানোর ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য ! ১৮৪৫ সালেই তিনি “লন্ডন ফার্মাকোপিয়ার” অনুবাদ শেষ করেন। এই বইটি ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। বইটির নাম দেওয়া হয়েছিলো “লণ্ডন ফার্ম্মাকোপিয়া” অর্থাৎ “ইংলন্ডীয় ঔষধ কল্পাবলী”। ১৮৪৯ সালের ২৭শে জুন তিনি “ফার্স্ট ক্লাস সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন” পদে আসীন হন।

বাংলা ভাষায় বেশ কিছু চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তিনি “অ্যানাটোমি ভাদি মেকাম”-এর বাংলা অনুবাদও করেছিলেন। ১৮৫২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজেই একটি বাংলা বিভাগ খোলা হয় এবং এই বিভাগে বাংলা মাধ্যমেই পঠনপাঠন চলতো। এই বিভাগে অধ্যক্ষ হিসেবে মধুসূদন গুপ্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কৃতিত্বের সঙ্গে সামলেছিলেন। ১৮৫৩ সালে মধুসূদন গুপ্ত প্রকাশ করেছিলেন ‘অ্যানাটোমি’। আমরা বর্তমানে অ্যানাটোমির বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘শারীরবিদ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করি, এই শব্দটিরও প্রচলন মধুসূদন গুপ্ত-এর কল্যাণে। তিনিই প্রথম কথাটা ব্যবহার করেন। আমৃত্যু দীর্ঘ ২২ বছর তিনি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। “সুশ্রুত” নামের একটি পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করতেন।

সব কিছুর উর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন সমাজ সচেতন ব্যক্তি, তাইতো সজোরে আঘাত করে জগদ্দল পাথরটিকে সরিয়েছিলেন। গ্রামগঞ্জের ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যাবস্থার উন্নতির জন্যে ভাবতেন। মাতৃভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চাকে গুরুত্ব দিতেন।

দেশের জনস্বাস্থ্য, পানীয় জলের জীবাণুমুক্তকরণ, পরিবেশ দূষণ মুক্ত করা ইত্যাদি নানান জণসচেতনা মূলক কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন সারা জীবন। তিনি নিজেছিলেন ডায়াবেটিসের রোগী। বারণ বিধিনিষেধ মানতেন না; সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও তিনি অনবরত শবব্যবচ্ছেদ করতেন এবং অন্যদের সাহস যোগাতেন। এই জীবাণু সংক্রমণেই ডায়াবেটিক সেপ্টিমিয়াতে আক্রান্ত হয়ে ৫৬ বছর বয়সে ১৮৫৬ সালের ১৫ই নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। চলে গেলেন ভারতের প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করা শল্য চিকিৎসক! ইতিহাস রচনা করে নিজেও বিলীন হলেন ইতিহাসের পাতায়। শুধু উপমহাদেশীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান নয়, তিনি পৃথিবীর বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি চিরন্তন উজ্জ্বলতম নাম। কবিরাজ থেকে শল্য চিকিৎসক, তাঁর জীবন যেন স্বপ্নের এক রূপকথা যার পরতে পরতে রয়েছে জয়ের গল্প।

শেয়ার করুন

close