দুর্গা পুজো : বাঙালির মাংস, ছাগ বলি এবং বর্তমান ভারত

শেয়ার করুন

সৌভিক রায় , কলকাতা : বাঙালির পাতে যতই দাপিয়ে ব্যাটিং করুক রোগান জোশ আর রেজালা, জিভের তৃপ্তি কিন্তু সেই বাঙালির মাংসেই! পুজো মানেই মাংস মাস্ট সে যাই হয়ে যাক। এইবারও নিউ নর্মালের পুজোয় মাংসের দোকানের লাইন দেখে হৃদযন্ত্র খানিক থেমে যাচ্ছিলো,খেতে খেতেই না একটা জাতি যমের বাড়ি পৌঁছে যায় কিন্তু তাও উৎসব বলে কথা। এমনও হেমন্ত দিনে বাড়ি ফেরো মাংস কিনে / যতোই বেড ভরে উঠুক বেলেঘাটা আই.ডি’তে।

এমনিতেই ভারতের পরিস্থিতি খুব একটা মাংস খাওয়ার অনুকূল নয়, যতই দেশ মাংস রপ্তানিতে দ্বিতীয় হোক…এ দেশে মাংস খাওয়ায় আপত্তি, কি আর করা! কিছু কিছু কটাক্ষ চোখে পড়লো নবরাত্রিতে নিরামিষ খাওয়া উচিত ! সেখানে কেন মাংসের দোকানে এতো লাইন, সেই সব ভক্ত নেটিজেনদের জন্য বলি এটা দুর্গা পুজো এখানে মাংস খাওয়া একটা রেওয়াজ, ওই পুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশই হয়ে গিয়েছে প্রায়। যদিও আজ দেশের চিড়িয়াখানার মাংসাশী প্রাণীদের খাবারের তালিকায় নাকচ হয়েছে মাংস, বোধ হয় ওদের কোলেস্টেরল বেড়ে যাচ্ছিলো। সে ওদের ব্যাপার ওঁরাই বুঝুন!
কিন্তু আমরা মাংস বলতে কিন্তু পাঠার মাংসকেই বুঝি আসলে কাঁসার জামবাটি থেকে থালার সাদা ধূমায়িত পাহাড়ের আলু সমেত লাল ঝোল না পড়লে ঠিক বাঙালির মাংস খাওয়া হয়না, সেই কবে পর্তুগিজদের হাত ধরে আলু এসেছিলো আর তারপর জ্যাক অফ অল ট্রেডস হয়ে গিয়েছে সে; শুক্তো থেকে বিরিয়ানি আলু না হলে আমাদের চলে না! মাংসই বা বাদ যায় কেন? সেই অমৃত হতে …..

বাঙালির নিজস্ব মাংস বলতে কিন্তু কষা আর ঝোল,এই ঝোল হলো একেবারে সাদা মাটা আলু দেওয়া লাল ঝোল যদিও লংকার উপস্থিতির পার্থক্যে কোথাও কিঞ্চিৎ ফিকে। দ্বিতীয়টি হলো বেশ মাখো মাখো ব্যাপার করে কষা যার রঙ বেশ কালচে।ঝোলের সেরা ঠিকানা হলো মায়েদের হেঁশেল আর কষার জন্য ঢুঁ মারতে পারেন শ্যামবাজারের গোলবাড়ি , ঘোড়সওয়ার নেতাজির মতোই সেও আজ এক ল্যান্ডমার্ক, শতাব্দী প্রাচীন কালচে কষা মাংসের আঁতুড়ঘর।এই সুদীর্ঘ সময়ে মাংস রান্নার পদ্ধতিও বদলেছে বাঙালির পাকঘরে , যেমন – ম্যারিনেশন। ওটা আমরা নকল করি আজকাল, কিন্তু ওটাই আমাদের রীতি ছিলো বাটামশলা, সর্ষের তেল দিয়ে মেখে রেখে তারপর রান্না করা হতো আর সেই সঙ্গে গোটা গরম মশলার ব্যবহার ছিলো চোখে পরার মতো। এটাই আমাদের মাংসের সনাতনী রান্না। আমাদের মাংসে কিন্তু রসুনের ব্যবহার বেশি হতো পেঁয়াজের চেয়ে। এটাই আমাদের বিশেষত্ব ছিলো।

এই রান্নার কথা বললে ঠাকুরবাড়ির কথা না বললেই নয় কারণ ওটাই আমাদের একমাত্র সেকালের হেঁশেল গবেষণাগার! ওদের মাংসের মাছের ঝোল এবং মাছের মাংসের ঝোল তো জগৎ বিখ্যাত তা ছাড়াও ঠাকুর বাড়ির আরেকরকম মাংস রান্নার কথা পাওয়া যায়, যেটি খানিক রাজস্থানী , কিঞ্চিৎ উত্তরপ্রদেশ ছাপযুক্ত। বাটা মশলার ব্যবহার কম, দই কাসুন্দি পড়তো সে রসনায়। আরেকটি মাংস বাঙালিদের মধ্যে বেশ চলতো তাহলো মাংসের নিরামিষ ঝোল আদা জিরে লঙ্কা বাটা দিয়ে ঝোল সেই জায়কা আসলে বলির মাংসের জন্যে; যেহেতু সেই মাংস ঈশ্বরের জন্য উৎসর্গ করা হতো তাই সেই মাংস পেঁয়াজ রসুন ছাড়াই রান্না করা হতো। ওই দেখতে রোগীরপথ্যের মতো হলেও খেতে কিন্তু হেব্বি!

যেমন আগে মহিষ থেকে মানুষ পর্যন্ত সবই বলি দেওয়া হতো আর এখন সবজি ফল ছাগল বলি দেওয়া হয়।
শাস্ত্রে বলা রয়েছে ছাগ বলি দিতে এই ছাগ মানে কিন্তু ছাগল নয়,বরং এখানে ‘ছাগ’ হলো ষড়রিপু অর্থাৎ’কাম’, ‘ক্রোধ’, ‘লোভ’, ‘মোহ’, ‘মদ’ (অর্থাৎ, হিংসা), ‘মাৎসর্য’ এইগুলিই একএে ষড়রিপু’ ; বিশুদ্ধ বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় “ষড়” শব্দের অর্থ হল – “ছয়” এবং “রিপু” শব্দের অর্থ হল – “শত্রু”। অর্থাৎ বিভিন্ন বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে “ষড়রিপু” হল – “সাধারণ প্রাণীদেহের ‘ছয়টি শত্রু’, যা প্রতিটি প্রাণীগণের ক্ষেত্রে ধ্বংসের প্রতীক। ছাগ বলি দেওয়ার অর্থ ষড়রিপুগুলি ভগব‍ানের কাছে ত্যাগ করা। কিন্তু এর প্রকৃত কারণ, উদ্দেশ্য না বুঝেই আমরা নিরীহ প্রাণীদের হত্যায় মেতে উঠি যা পুণ্য নয়, কেবল পাপের ভাগীদারই করে আমাদের!

শেয়ার করুন

close