প্রীতম সাঁতরা:-গ্রিস দেশের প্রখ্যাত দার্শনিক মার্কোস অরিলিয়াস বলেছেন, “এক দিকে ক্ষতি হইলে, আর এক দিকে তাহা পূরণ হইয়া থাকে। এই সমস্ত চিন্তা করিয়া তুমি সন্তুষ্ট হও, এবং ইহাকেই তোমার জীবনের বীজমন্ত্র করিয়া জীবননির্বাহ কর।”

এইমুহূর্তে এই উদ্ধৃতিটি জীবনের সার সত্য বলে মনে হতে পারে। করোনাবেলায় আমাদের জীবন সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। কেউ হেরে গেছে আবার কেউ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতে কে কেমন আচরণ করবে সেটা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল। সিলেবাসের বাইরে আসা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ধীরতা এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। একশ’ শতাংশ নম্বর না পেলেও অন্তত পাস করার মতো নম্বরটুকু যেন আমরা পেতে পারি, এটাই এখন কাম্য। পরিস্থিতির সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শিখছি আমরা। বদলে যাচ্ছে অনেক অভ্যাসই।



কিন্তু, বদল আসছে না কিছু ‘কু-অভ্যাস’-এ। বিশ্বব্যাপী মানুষ ভাইরাসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যখন তাকিয়ে রয়েছেন চিকিৎসক, গবেষকদের দিকে, তখন কিছু মানুষের কাছে তাদের পরিত্রাতা সে-ই ‘অপসংস্কৃতি’, ‘কুসংস্কার’। এখনও কিছু মানুষ মনে করছেন কোনও অলৌকিক ক্ষমতা বল-এ সমাজ থেকে নিমেষে লোপ পেতে পারে করোনা ভাইরাস। ‘করোনা পুজো’ কিংবা ‘ঈশান কোণের মাটি জিভে ঠেকিয়ে’ রাখার মতো ঘটনাই তার প্রমাণ। গ্রামের দিকে তো বটেই, শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে এই সমস্ত টোটকা-কথা। পাথরে তেল, সিঁদুর লেপে তাকে দেওয়া হচ্ছে ‘অলৌকিক’, ‘যাদুশক্তি’ অথবা ‘আরাধ্য দেবতা’র আখ্যা। শাঁখ-ঘন্টা বাজিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ভাইরাস দূরীকরণের পুজো চলছে। অন্যান্য দেশের মতো স্বাস্থ্যকর্মীদের উৎসাহ দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আহ্বানে দেশবাসী যেভাবে সাড়া দিয়েছিল, তা ভারতের ইতিহাসে নজির হয়ে থাকবে।



দুর্গা পুজো যদি দুর্গা ঠাকুরকে কেন্দ্র করে, কালী পুজো যদি কালী ঠাকুরকে নিয়ে বা অন্যান্য পুজো যদি সেই সমস্ত উপাস্য দেব-দেবীর নামে উৎসর্গকৃত হয়ে থাকে, তাহলে ‘করোনা পুজো’ও নিশ্চয়ই ‘করোনা ঠাকুর’কে কেন্দ্র করে? মানে হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবতার তালিকায় অচিরেই যুক্ত হয়েছে আরও একটি নাম? ২০২০ সালে দেবতার জন্ম! যদিও শিবরাম চক্রবর্তী মহাশয় বহু আগেই ‘দেবতার জন্ম’ লিখে গিয়েছেন। “অনেকদিন পড়ে গলির মোড়ের অশথতলা দিয়ে আসছি- ও হরি! এখানে নুড়িটাকে নিয়ে এসেছে যে! নুড়ির স্থুল অঙ্গটা গাছের গোড়ায় এমন ভাবে পুঁতেছে যে উপরের উদ্ধৃত গোলাকার নিটোল মসৃণ অংশ দেখে শিবলিঙ্গ বলে ওকে সন্দেহ হতে পারে। এই প্রয়োগ-নৈপুণ্য যার, তাকে বাহাদুরি দিতে হয়। নুড়িটার চারদিকে ফুল বেলপাতার ছড়াছড়ি”।( দেবতার জন্ম, শিবরাম চক্রবর্তী)



বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “হিন্দুর মুখে তো শুনি, হিন্দুর দেবতা তেত্রিশ কোটি। কিন্তু দেখি বেদে আছে, দেবতা মোট তেত্রিশটি।” নিজের কথার প্রমাণে কিছু শ্লোকও প্রমাণ তুলে ধরেছেন তিনি, “ঋগ্বেদ-সংহিতার প্রথম মন্ডলের, ৩৪ সুক্তের ১১ ঋকে অশ্বীদিগকে বলিতেছেন, ‘তিন একয়াদশ (১১ ৩=৩৩) দেবতা লইয়া আসিয়া মধুপান কর’।” কিংবা, “অগ্নিকে বলা হইতেছে, ‘তেত্রিশটিকে লইয়া আইস’।” অর্থাৎ তেত্রিশ থেকে লম্বা হয়ে তেত্রিশ কোটি! সে অন্য দর্শন। আবার বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “দিব্ ধাতু হইতে দেব। দিব্ দীপনে বা দ্যোতনে। যাহা উজ্জ্বল তাহাই দেব। আকাশ, সুর্য্য, অগ্নি, চন্দ্র প্রভৃতি উজ্জ্র্বল, এই জন্য এই সকল দেব।” প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ বা পর্যায়ের উপর ভিত্তি করে রয়েছে একাধিক দেবতার নাম। যার মূল ভিত্তি প্রকৃতির প্রাণদায়ী শক্তি যেমন- অগ্নি, বৃষ্টি, বায়ু ইত্যাদি… যারা অজ্ঞ, লেখাপড়ার করেননি তাঁরা এসব কথা অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু যাঁরা পড়াশোনা করেছেন তাঁরা কি আদৌ শিক্ষার কোনও মূল্য রাখেন?

অভূতপূর্ব কিছু প্রাকৃতিক শক্তি মানুষের মন-কে নাড়া দিল বলে, সেসব দেবতা হয়ে উঠল, তার সঙ্গে এমন কিছু দিকপাল মানুষও তো পৃথিবীতে জন্মেছিলেন, যাঁদের কর্মবলে একদা নড়ে উঠেছিল মানবজাতির মন। যেমন স্বামী বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, মাদার টেরেসা, শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদা মা… এবং আরও বহু ব্যক্তিত্ব। এঁনারা মানুষ হয়েও অনন্য। তা-ই এইসব মনীষীদের মূর্তি সামনে রেখে দেবতা জ্ঞানে পুজো করা হয়ে থাকে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যের বিষয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘পুজো’ বলতে বুঝেছে, মূর্তি হয়ে মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে নিজের চাহিদা পূরণের স্বপ্ন দেখার অভ্যাস।



“Is religion to justify itself by the discoveries of reason through which every other science justifies itself?… In my opinion this must be so, and I am also of opinion that the sooner it is done the better.”(অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো ধর্মও কি যুক্তবিচারের দ্বারা চালিত হবে?… আমার মতে নিশ্চয়ই হবে এবং যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল।) স্বামী বিবেকানন্দের এই কথা কেউ মনে রেখে তাঁকে স্মরণ অথবা ‘পুজো’ করেন, এ কথা আর বলা যায় না।

যা বোঝা যাচ্ছে, জ্ঞানের থেকে অভ্যাসকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে মানবজাতি। সেই অভ্যাস ‘সু’ না ‘কু’ সেই প্রশ্নের উদয় হয় না বেশিরভাগেই মনে। মনে রাখতে হবে সব সৃষ্টি মূলেই রয়েছে ‘প্রশ্ন’। প্রশ্ন করার অভ্যাস না তৈরি করলে আরও অন্ধকারের দিকেই এগোবে সমাজ, সভ্যতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁকে বাঙালি দেবতা জ্ঞানে পুজো করেন, তিনি লিখে গিয়েছেন, “অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে–. নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে…।” অন্তর অর্থাৎ মন, মন অর্থাৎ ভাবনা, খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের প্রয়োজন অন্তরের বিকাশ; আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি, মুক্তচিন্তাই হয়ে উঠবে আমার একমাত্র আরাধ্য দেবতা।

তথ্যসূত্র-
১) দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২)ভারতের আধ্যাত্মবাদ (বিশ্বভারতী প্রকাশনী)
৩) মার্কাস অলিরিলিয়াসের আত্মচিন্তন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪) শান্তিনিকেতন (প্রথম খন্ড)- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫) কালীঘাটের পুরাতত্ব্ব- সুর্যকুমার চট্টোপাধ্যায়