Logo
News Categories
HomeEntertainmentপ্রসঙ্গ ‘গুমনামী’

প্রসঙ্গ ‘গুমনামী’

প্রসঙ্গ ‘গুমনামী’

সুরঞ্জন দাস:-

‘….তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মাহমৃতং গময়’। অন্ধজনে দেহ আলো,মৃতজনে প্রাণ। কে দেবে? কে দেবে আলো? কে দেবে প্রাণ? ৭৪ বছরের ঘৃণ্য রাজনৈতিক অন্ধকারে গলা টিপে লুকিয়ে রাখা সত্যকে মাটি ফুঁড়ে বার করতে গেলে যে ক্যাডার কেউটেরা ফণা তুলে বসে,তা থেকে স্বয়ং দেশনায়ককে রক্ষা করতে গেলেও যে একটা গোটা পার্লামেন্ট ভেঙ্গে চুরে নষ্ট হয়ে যায়। প্রশ্ন করার অধিকার থাকলেই তাকে কেড়ে নিতে হয়,কারণ ‘ওরা যত বেশি পড়ে,তত বেশি জানে,তত কম মানে’।


তাৎপর্য এইখানেই। জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা অস্থিভস্মের ডি.এন.এ টেস্ট করার বা অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল রিপোর্ট পেশ করার বিষয়টা বারবার পিছিয়ে দেওয়ার পেছনে যে বিরাট রাজনৈতিক অহিংস আন্দোলনের স্ট্যান্ডার্ড মুচলেকা রয়েছে তাকে এক নিমেষে খারিজ করবে কোন কমিশন? ঠিক এই বিতর্ক নিয়েই ছবির নন-লিনিয়ার স্ট্রাকচার,এই সম্ভাবনা নিয়েই ছবির চিত্রনাট্যের বুনট,এই প্রোপ্যাগান্ডার খাতিরেই ছবির সাবজেক্টিভ ইমপালস।

ছবি শুরু হয় হরিপুরা কংগ্রেসে সীতারামাইয়ার ২০৩ হারের পরবর্তী অবস্থা থেকে। এখানে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট-এর জায়গায় সৃজিত ভীষণ ডিরেক্ট,এস্টাবলিশমেন্টের তোয়াক্কা রাখেনই নি তিনি। বোঝাই যাচ্ছে তার সময় কম,এই পরিসরে তাকে অনেক কিছু বলতে হবে,সেক্ষেত্রে ব্যাকস্টোরির প্রতি কোনো লক্ষ্য না রাখাই স্বাভাবিক। এই ছবিতে সুভাষকে নিয়ে কাজ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই স্বতন্ত্রতা খুব জাস্টিফায়েড। কারণ এক্ষেত্রে তার প্রোপাগাণ্ডা সুভাষের জীবন নয়। সুভাষের মৃত্যু।

কিন্তু তারপর? সুভাষের মৃত্যুর আজ অবধি তিনটে থিওরি আছে। ঠিক বা ভুল বা সত্যি বা মিথ্যে,এ নিয়ে বিতর্ক থাকবে। একদল আছেন যারা বিশ্বাস করেন সুভাষ ও গুমনামী বাবা একই ব্যক্তি। অন্যদল দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। পক্ষান্তরে এরই মাঝে একেবারেই চাপা পড়ে যায় দ্যা ডেথ ইন সাইবেরিয়া। অতএব সুভাষ বোস ষড়যন্ত্র কাণ্ডের তিনটে ডাইমেনশন থাকা উচিৎ(ব্যক্তিগত বিশ্বাস ব্যতিরেকে)। স্পষ্টতই রায় ঘোষণা করার মতো কোনো ‘ক্লিঞ্চিং এভিডেন্স’ নেই। তাই এই ছবির ইউ এস পি হওয়া উচিত আ ক্রিটিকাল অ্যামবিগুয়িটি। কিন্তু এখানেও যে সেই রাজা ফিরে ফিরে এলো। সাদা কালো অতীতের রহস্যাবৃত সুভাষ এসে সরাসরি রঙ দিলেন ফৈজাবাদের গুমনামী বাবার গেরুয়া গ্রন্থির ভাঁজে,সেই সাথে সোজাসাপ্টা এও যেন বলে দেওয়া হলো যে এতোদিন পোষা প্রশ্নের উত্তর ভারতবর্ষ অনেককাল আগেই পেয়ে গেছেন,শুধু দেখতে চাইছেন না বলে দেখছেন না। এমনকি মুখার্জি কমিশন রিপোর্টে কালাশনিকভের বক্তব্যের অত বড়ো রাশিয়ান অ্যাঙ্গেলটা বেমালুম চেপে গিয়ে একেবারে উত্তরপ্রদেশেই আস্থা ছেড়ে চলে গেলেন পরিচালক? খাপে খাপ বসানোর চেষ্টা নয় কি? যাতে আগের দুটো কমিশনই এতোদিনে কমপ্লিট নালিফাই হয়ে যায়?



দারুন সমস্ত ক্যামেরা ওয়র্ক।দুর্দান্ত লং শট,মিড শট,ড্রোন শট,অসাধারণ কালার কারেকশন,দুরন্ত এডিটিং,দারুন টাইটেল ম্যাপিং- এই সব কিছু মিলে যেই মুহূর্তে মনে হবে হয়তো এই সিনেমাই হতে চলেছে এই যুগের এক মূর্তিমান এপিক,ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্লিশে নেতাজি বিদ্বেষ এবং জোর করে অ্যাসাইনমেন্টের চক্করে পড়ে অবসেসড ‘নেতাজি’ থুড়ি ‘গুমনামী’ হয়ে ওঠা চন্দ্রচূড় ধর ওরফ অনির্বাণ ভট্টাচার্য্যের অতি অভিনয় ধাক্কা মেরে বুঝিয়ে দিয়ে যায়,আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,সুভাষ উঠলো ‘ভগবানজি’ হয়ে। বলা বাহুল্য চিত্রনাট্যের মেদহীনতা এই ছবির অন্যতম ধারক,যেখানে সর্বপ্রথম কনসিডার করতে হয় মুখ্য চরিত্রে প্রসেনজিতের অভিনয়। এতো কনক্রিট অভিনয় করতে জানেন বলেই হয়তো চরিত্রায়ন সার্থক,যদিও নেতাজির মেক-আপে একটা সাজানো ব্যক্তিত্বের প্রচেষ্টা বারবার চোখে পড়ে অস্বস্তি থেকে যায়ই।

আর সিনেমা?না ডকু-ফ্যাক্ট? শেষ নাহি যে,শেষ কথা কে বলবে? যে দেশনায়ককে নিয়ে এতো কথা তার জন্ম আছে,মৃত্যু নেই? দিন মাস সাল সবেতেই কেবল জিজ্ঞাসা চিহ্নের দাগ। আহা! যদি এমনটা হতো গুমনামী সত্যিই হতেন আমাদের নেতাজি? আচ্ছা যদি নেতাজি গুমনামী হন,তাহলে তিনি দেশের কাছে ধরা দিলেন না কেনো? আর যদি গুমনামী নেতাজি হন,তাহলেও বা তিনি পরিবারের কাছে ফিরে এলেন না কেনো? রাত কতো হয়,উত্তর মেলে না।



উত্তর বড়ো বালাই। এ ছবি দিয়েছে সেই উত্তর। সুভাষ বোস মানে শুধু রক্ত মাংস চশমা আজাদ হিন্দ প্লেন ক্র‍্যাশ রাশিয়া গুমনামী নয় যে। সুভাষ মানে বোধ সত্য ত্যাগ তিতিক্ষা শক্তি। সুভাষ মানে গতি বৃদ্ধি স্মৃতি ধর্ম প্রশ্ন। সুভাষ মানে আস্থা,সুভাষ মানে যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধই করে যেতে হবে আজীবন। আজীবন আমাদের ভেতরে অল্প অল্প সুভাষকে দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে দেশনায়কের জীবন্ত জিজ্ঞাসা। নেতাজি মৃত্যু নেই। সংগ্রাম আর সংগ্রামীর মধ্যে যেটুকু তফাৎ তাতে নেতাজি অমর। ‘গুমনামী’ থাকলেও অমর,না থাকলেও অমর। কে বলতে পারে,হয়তো এই যুদ্ধেই একদিন অল্প অল্প করে বেড়ে ওঠা সমস্ত সুভাষদের কাঁধে হাত রেখে এক সৌম্য চেহারার তরুণ দৈবকন্ঠে বলে উঠবে- ‘ জিন্দেগি হ্যা কউম কি তু কউম পে লুটায়ে যা।’ একটা ডি.এন.এ টেস্টের কি সত্যিই প্রয়োজন বোধ করছেন না? হে সকল “নেতাজির পরিবারের সন্তান”?

No Comments

Leave A Comment

error: Content is protected !!